সামনের বছর দেশের সিমেন্ট খাত ঘুরে দাঁড়াবে

গত বছর কেমন গেল দেশের সিমেন্ট খাতের ব্যবসা?

২০২৩ সালে দেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছে। ব্যবসা কেমন গেল যদি বলতে হয় তাহলে বলব ভালো না। কারণ ২০২১ সালে ৩ কোটি ৯৫ লাখ টন সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছিল। এর পরের দুই বছর ২০২২ ও ২০২৩ সালে যেখানে সিমেন্টের বিক্রি বাড়ার কথা সেখানে এটি কমেছে। এমনকি এ বছরের জানুয়ারিতেও ব্যবসা ভালো যায়নি। ফলে বলতে হয় আমরা যারা সিমেন্ট খাতে আছি তাদের অবস্থা খুব একটা ভালো না।

গত বছর কেমন গেল দেশের সিমেন্ট খাতের ব্যবসা?

ডলারের সংকটের একটি প্রভাব তো ছিলই। সরকারের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) কারণে রাজউক থেকে বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের বাড়িঘর নির্মাণ ও আবাসন খাতে। এর মধ্যে সরকারের অবকাঠামোগত প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ আছে। এসব কিছুর প্রভাবেই সিমেন্টের বাজার স্থবির হয়ে আছে। দেশের সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা ৯ কোটি ৩০ লাখ টন। অথচ ব্যবহার হচ্ছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। ফলে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।

এ বছরও কি সিমেন্টের ব্যবসা মন্দা যাবে? নাকি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে?

এ বছরও সিমেন্টের বাজারে প্রবৃদ্ধি হবে বলে মনে হয় না। কারণ নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, সবকিছু আবার গুছিয়ে উঠতে একটু সময় লাগবে। সামনে বাজেট আছে। বাজেটের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছি। আমরা আশাবাদী এ বছর যেমনই হোক আগামী বছর থেকে সিমেন্টের বাজার ভালো হবে। পাশাপাশি ডলার সংকট ও এলসি খোলার জটিলতাগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলে সেটি বাজার বাড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। আপনি যদি বৈশ্বিক পর্যায়ে জনপ্রতি সিমেন্ট ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেন তাহলে আমাদের এখানে সিমেন্টের বাজার বড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিশ্বের জনপ্রতি সিমেন্টের ব্যবহার ৫৫০ কেজি। যেখানে আমাদের জনপ্রতি ব্যবহার হয় ২৩০ কেজি। ফলে আমাদের সুযোগ আছে ভালো করার। এ কারণেই তো সবাই নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছিল। 

গত তিন বছরের সংকটের আগে থেকেই তো সিমেন্ট খাতের সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকছে।

দেশে সিমেন্টের ব্যবহার বাড়ানোর পেছনে সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত বিশ্বে কংক্রিটের রাস্তা। কিন্তু আমাদের এখানে বিটুমিন দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়ে থাকে এবং এগুলোর স্থায়িত্বও কম। এক্ষেত্রে দেশে কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার মাটির উর্বরতা কমতে দিতে চায় না। এজন্য মাটি কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এটি বাস্তবায়ন হলে তখন মাটির পরিবর্তে যদি সিমেন্টের ইট আসে এবং হলো ব্লক তৈরি হয় তাহলে তো সিমেন্টের ব্যবহার বেড়ে যাবে। এসব বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিজমির পরিমাণ যাতে না কমে সরকারের সে চেষ্টা রয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রামে-গঞ্জে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

ডলারের সংকট কি কেটেছে? এর প্রভাবে চাহিদা অনুসারে কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি?

কাটছাঁট করতে হচ্ছে। মজুদ পণ্য রাখতে পারছি না। আগে আমাদের দুই-এক মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকত। কিন্তু এখন দিন আনি দিন খাই অবস্থা। আগাম পণ্য আনতে পারছি না, কারণ দুই মাস পরে যদি ডলারের দাম আরো বেড়ে যায় তাহলে বাড়তি এ দাম কোথা থেকে সমন্বয় করব। কারণ অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে সিমেন্ট খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। ফলে চাইলেই সহজেই দাম বাড়ানো সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছি।

বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় কেমন বেড়েছে?

কাঁচামালের দাম ১ ডলার বাড়লে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে ৬ টাকা। জাহাজ ভাড়া ২ ডলার বাড়লে প্রতি ব্যাগে ব্যয় বাড়বে ১২ টাকা। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কর্মীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির মতো ব্যয় তো রয়েছেই। ডলারের দাম স্থিতিশীল না হলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

দেশে যেহেতু সিমেন্টের প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে আছে সেহেতু বিদেশে রফতানির মাধ্যমেও তো অব্যবহৃত সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব।

সিমেন্ট যত দূরে যাবে এর দাম তত বাড়বে। ফলে রফতানির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে আপনাকে থাকতে হবে। আমাদের তিন দিকে ভারত। এর মধ্যে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট রফতানি করা সুবিধাজনক। কিন্তু সেখানেও বর্তমানে আমরা রফতানি করতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছি। গত বছরের ডিসেম্বরে আমাদের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে সব ধরনের কাগজপত্র ও শর্ত পূরণ করে লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করা হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেটি অনুমোদন করছে না। আমরাসহ আরো বেশ কয়েকটি কোম্পানি এ সমস্যার মধ্যে পড়েছে। হয়তো ভারতীয় কর্তৃপক্ষও এ মুহূর্তে চাইছে না বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সিমেন্ট আমদানি করতে। এছাড়া আমরা ক্লিংকার আমদানি করে সিমেন্ট উৎপাদন করে থাকি। ফলে আমাদের পক্ষে সিমেন্ট রফতানির সম্ভাবনা কম। যদি আমরা ক্লিংকার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতাম তাহলে সেটি রফতানি করা যেত।

ইউসিআইএলের ব্যবসা কেমন চলছে?

আমরা তো বাজারের বাইরে নই। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে আরো বড় করা যায়, ক্রেতার কাছে পৌঁছা যায়। আমাদের একটি পণ্য ছিল ফ্রেশ সিমেন্ট। সেটিতে ক্লিংকারের পরিমাণ বাড়িয়ে, মানে খরচ আরো বাড়ানোর মাধ্যমে এর গুণগতমান বাড়িয়ে ফ্রেশ আল্ট্রা স্ট্রং নিয়ে এসেছি। আরেকটি পণ্য মেঘনাসেম ডিলাক্সে ক্লিংকার বাড়িয়ে, গুণগত মান বৃদ্ধি করে মেঘনাসেম সুপার ডিলাক্স করেছি। আরেকটি নতুন ক্যাটাগরি সিমেন্ট নিয়ে এসেছি আমরা, যেটি অন্য কারো নেই। এটি হচ্ছে ৪২ দশমিক ৫ আর সক্ষমতার ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট। এটি দ্রুত জমবে ও শক্তি দেবে। এতে প্রকল্পের ব্যয় কমবে। এ ধরনের কিছু নতুন পণ্য প্রচলন ও গুণগতমান বাড়ানোর মাধ্যমে আমরা বাজারে অংশীদারত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বিপণন ও সরবরাহ কৌশলে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে আরো ভালো করার চেষ্টা রয়েছে আমাদের।

আপনাদের সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতা কত? এ খাতে কত বিনিয়োগ রয়েছে এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে কি?

আমাদের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ৭০ লাখ টন। এখন আমরা ৫৫ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছি। এটিকে আরো বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে। যদি আমরা সক্ষমতার ৯০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারি তখন সম্প্রসারণের কথা চিন্তা করব। এক্ষেত্রে আমরা ঢাকার বাইরে নতুন কারখানা করার চিন্তা করতে পারি। তবে আপাতত সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই। সিমেন্ট খাতে আমাদের ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ রয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে সিমেন্ট খাত কোন অবস্থানে যাবে বলে মনে করছেন?

আমরা বর্তমানে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে আছি। সিমেন্টের বাজারের ৮০ শতাংশই শীর্ষ ১০ কোম্পানির দখলে। আমরা চাই সবাই টিকে থাকুক, সিমেন্টের চাহিদা বাড়ুক ও দেশ উন্নত হোক। যেখানে বড় কোম্পানিগুলোরই টিকে থাকতে কস্ট হচ্ছে, সেখানে ছোটরা বন্ধ হয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক।

কর-সংক্রান্ত বেশকিছু বিষয়ে সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন। সামনের বাজেটে এ বিষয়ে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

অগ্রিম আয়করকে দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি অগ্রিম আয়করকে চূড়ান্ত হিসেবে ধার্য করা থেকে যাতে রেহাই দেয়া হয় সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। আমি সিমেন্ট খাতের এমন কিছু কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন দেখেছি, যেখানে কোম্পানির যে পরিমাণ লোকসান হয়েছে তার চেয়ে বেশি তাকে আয়কর দিতে হয়েছে। বর্তমানে প্রতি টন ক্লিংকার আমদানি হচ্ছে ৪৩ ডলারে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এটিকে মূল্যায়ন করছে ৬০ ডলারে। এটি কেন? প্রতি মাসে আমদানি ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করে এটিকে বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। ৪৩ ডলারের ক্লিংকারকে ৬০ ডলার হিসেবে মূল্যায়ন করা হলে কেউ কেউ তো এর সুযোগ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারও করতে পারে।